• বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০১:০২ অপরাহ্ন

শব্দকর সম্প্রদায়ঃ কমলগঞ্জে বসবাস করা এক অবহেলিত জাতিগোষ্ঠী – সৈয়দ মাসুম লন্ডন থেকে

সৈয়দ মাসুম / ৩৩৪ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশিত : শুক্রবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৫

জন্মই যেন তাঁদের আজন্ম পাপ। চরম দারিদ্রতা আর অশিক্ষা কুশিক্ষায় বেড়ে উঠা শব্দকর সম্প্রদায়ের মানুষগুলো ঢাক ঢোল পিঠিয়ে অন্যকে আনন্দ দিলেও তাঁদের জীবনে যে আনন্দ বলে কিছু আছে সেটি উপলব্ধি করা খুবই দুরহ। মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলায় বাঙালি ও অবাঙালি দুই ধরনের দলিত সম্প্রদায়ের রয়েছে বসবাস।
অবাঙালি দলিত চা শ্রমিকদের পাশাপাশি এই উপজেলার বাঙালি দলিতদের বড় অংশটি হচ্ছে এই শব্দকর সম্প্রদায় স্থানীয় ভাবে যারা ডুকলা নামে পরিচিত।
ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সম্পাদিত ’বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান ’ গ্রন্থে থেকে জানা যায় ডুকলা শব্দটি অসভ্য ,নিকৃষ্ট জাতি বা গোষ্ঠী অর্থে ব্যবহৃত হয়।
শব্দকররা প্রাচীন ভারতের কুল ,ভীম ,সাঁওতাল ,মুন্ডা ইত্যাদির ন্যায় একটি প্রাচীন অনার্য জাতি। উপমহাদেশে
আদিবাসী বলে আমরা যে কয়েকটি গোষ্ঠী সম্প্রদায়কে বুঝে থাকি এই জনগোষ্ঠী হচ্ছে তাঁদের একটি।
বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় কমলগঞ্জ উপজেলার আলীনগর ,মুন্সিবাজার ,আদমপুর ,রহিমপুর সহ মোট নয়টি ইউনিয়নের মোট ৩৭টি গ্রামে প্রায় ১হাজার ৪০০ শব্দকর পরিবার বসবাস করে।
হত দরিদ্র এই সম্প্রদায়ের মানুষগুলো সমকালীন সমাজে দরিদ্রের যে সীমারেখা চিহ্নিত করা হয় শব্দকররা সেই সীমারেখার চেয়েও নিচু অবস্থানে দিনাতিপাত করে।
এদের সমাজে নারী পুরুষ উভয়েই কৃষি কাজ করে। এমনকি হাটবাজার করতেও পুরুষদের পাশাপাশি নারীদেরকেও সমানতালে দেখা যায়।
এই সম্প্রদায়ের উপাস্য দেবতা হচ্ছেন শিব। এদের সকলেই সনাতন ধর্মে বিশ্বাসী তবে বাঙালি অন্যান্য সনাতন ধর্মীরা এদেরকে অস্পৃশ্য বলে বিবেচনা করে।
তাঁদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব হচ্ছে চড়ক পূজা। কমলগঞ্জের ছয়ছিরি সহ আরও বেশ কয়েকটি জায়গায় চৈত্র মাসের শেষ দিন এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়।
পানি থেকে একটি বিশেষ গাছ তুলে এনে মাটিতে পুঁতে খাড়া গাছটিতে রশির সাথে শিকল বেঁধে নিজের শরীরের চামড়ায় শিকলের ধারালো অংশ বড়শির মতো ঢুকিয়ে এরা গাছের সাথে ঝুলে ঘূর্ণিপাক খায়।
এরা শিবের গান ও গাজার গানও গেয়ে থাকে।
আদি পেশা বাদ্য বাজনা হলেও বর্তমানে এদের বড় অংশ দিনমজুর ,রিক্সা ভ্যান চালক আর ভিক্ষাবৃত্তি করে।
শিক্ষা ,স্বাস্থ্য ,ভূমির মালিকানা আধুনিক সভ্যতার এই সকল সুযোগ সুবিধা থেকে তাঁদের অবস্থান অনেক দূরে।
বাংলাদেশের আইনে উপজাতি ও নৃ-জাতি গোষ্ঠীর জন্য যে সব সুযোগ সুবিধা রয়েছে বা এরা পেয়ে থাকে আদিবাসী এই সম্প্রদায়ের জন্য তদ্রুপ কোন সুযোগ সুবিধা আছে কিনা জানা যায়নি তবে এরা যে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা থেকে হাজার বছর পিছিয়ে আছে তা অনায়াসে বলা যায়।
(কমলগঞ্জ উপজেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য গ্রন্থ থেকে সংকলিত )
তথ্যসূত্র
দক্ষিণ সিলেটের আদিবাসী ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা -সৈয়দ মাসুম সাপ্তাহিক সুরমা সাহিত্যসাময়িকী জুন ২০১৮ যুক্তরাজ্য
শতাব্দী ১৯৮২ মৌলভীবাজার মহকুমার শতবর্ষপূর্তি সংকলন
সম্ভাবনাময় মৌলভীবাজার জেলা ১৯৮৬ মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসন কর্তৃক প্রকাশিত
কমলগঞ্জ উপজেলা পরিচিতি -২০১৫ কমলগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক প্রকাশিত।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ পড়ুন...
Developed By Radwan Web Service