• বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০২:৩১ অপরাহ্ন

কমলগঞ্জ নামের উৎপত্তি কিভাবে এবং কখন হয়

সৈয়দ মাসুম / ৩৭৩ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৫

ব্রিটিশদের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে বিভিন্ন মিরাশদার ,জমিদার ও তালুকদারগণের ভূমি মালিকানা চলে যায়।এমনি এক পরিস্থিতিতে আজকের কমলগঞ্জ এলাকারও মালিকানা হস্তগত হয় কলকাতাবাসী নওগাঁর ধুবল হাটির জমিদার কিং করীনাথ রায় চৌধুরীর হাতে। সেই সময়ের নিয়ম অনুযায়ী বড়বড় জমিদাররা তাঁদের নিযুক্ত নায়েবদেরকে দিয়ে জমিদারি চালাতেন এবং এরা রাজস্বও আদায় করতেন।  কিংকরী নাথ রায় চৌধুরীর নায়েব কমল নারায়ন রায় এই এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত হন।কথিত আছে যে, ১৮৯৯খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ১৩০৬বাংলায় ধলাই নদীর তীরে পানিশালা মৌজায় কমল নারায়ন তাঁর নামে একটি বাজার সৃষ্টি করেন আর এই ভাবেই উৎপত্তি ঘটে কমলগঞ্জ নামের। কমলগঞ্জের নামকরনের বিষয়াদির স্বপক্ষে কোন দলিল দস্তাবেজ পাওয়া যায়নি এটির পুরোটিই জনশ্রুতির উপর নির্ভরশীল। তবে একটি দলিল থেকে প্রমাণ পাওয়া গেছে ইংরেজ আমলের শেষ দিকে এই এলাকাটি কিংকরী নাথ চৌধুরী নামে এক ব্যক্তির জমিদারিভুক্ত ছিল। কমল নারায়ন রায় তাঁর নায়েব হিসাবে উক্ত জমিদারি দেখাশুনা করতেন।
বর্ণনাটি পাওয়া যায় ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে সাকির উদ্দিন আহমদ কর্তৃক সম্পাদিত সম্ভাবনাময় মৌলভীবাজারে সংকলনে কমলগঞ্জ গণমহাবিদ্যালয়ের তৎকালীন অধ্যক্ষ বাবু রসময় মোহান্তের ‘কমলগঞ্জ উপজেলা’ শীর্ষক প্রবন্ধে ।
‘কমলগঞ্জ উপজেলা পরিচিতি’ নামক একটি সংকলন ২০১৫খ্রিস্টাব্দে কমলগঞ্জ উপজেলা পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত হলে উক্ত গ্রন্থেও গবেষক হারুণ আকবর তাঁর ‘কমলগঞ্জের ইতিহাস’প্রবন্ধে সম্ভাবনাময় মৌলভীবাজার সংকলনের রেফারেন্স দিয়ে এই মতটিকেই তুলে ধরেন। নামকরণের বিষয়ে কমলগঞ্জ এলাকায় আরও একটি জনশ্রুতি আছে যে এক সময় ত্রিপুরা রাজ্যে উৎপাদিত কমলা ধলাই নদী দিয়ে নৌপথে আসাম ও পূর্ববঙ্গে পাঠানো হত। এরই প্রেক্ষিতে ধলাই নদীর তীরে দুটি নৌবন্দর গড়ে উঠে যার একটির নাম কমলাপুর আর অপরটির নাম কমলাগঞ্জ। সিলেটি ভাষায় নামের মধ্যাক্ষরে আকার চিহ্নের ব্যবহার কম (যেমন রাসূল সিলেটি ভাষায় রছুল ,সাইফুর সিলেটি ভাষায় ছয়ফুর )এই কারণে এক সময় কমলাগঞ্জ কমলগঞ্জ হয়ে যায় তদ্রুপ কমলাপুর কমলপুরে রূপান্তরিত হয়।
নামকরণের এই জনশ্রুতিটি অধ্যক্ষ রসময় মোহান্ত ও গবেষক হারুণ আকবরের প্রবন্ধে উঠে আসেনি।
জনশ্রুতির দ্বিতীয় মতটি যারা গ্রহণ করেন তাঁদের যুক্তি হচ্ছে ১৮৯৯খ্রিস্টাব্দে নয় এরও বহু পূর্বে যখন এই অঞ্চল সুবা বাংলার সাথে যুক্ত হয় তখন ত্রিপুরা থেকে সিলেট যাবার রাস্তা তৈরী হয় আর ঐ সময় ধলাই নদীর তীরে এবং ত্রিপুরা সিলেট সংযোগ সড়ক ঘেঁষে ব্যবসা বাণিজ্যের সুবিধার্থে দুটি নৌবন্দর তৈরি করা হয় যার একটি বর্তমান ত্রিপুরা রাজ্যের ধলাই জেলার কমলপুর থানা সদর আর অন্যটি বাংলাদেশের মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ থানা সদর।
তাঁরা এটিও বলে থাকেন যে ,কমলগঞ্জে এক সময় কমল নারায়ন নামক জনৈক নায়েবের কর্তৃত্ব থাকলেও কমলপুরে উনার কোন কর্তৃত্ব ছিল না সুতরাং কমলপুর নাম কমল নারায়নের নামে হওয়ার প্রশ্নই আসেনা। তাঁরা কমলপুর ও কমলগঞ্জ এই দুটি নামের উৎস একই বলে ধারণা করেন।
দ্বিতীয়ত ১৮৯১খ্রিস্টাব্দে যখন পানিশালা মৌজায় কমলগঞ্জ এম ই স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয় যেটি এখন কমলগঞ্জ সরকারি মডেল হাই স্কুল নামে পরিচিত। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে আসাম ডিস্ট্রিক গেজেটিয়ার্স রিপোর্টেও এই স্কুলের নাম ও প্রতিষ্ঠাকাল বর্ণিত আছে। এ থেকে প্রমাণিত হয় নওগাঁর জমিদার কিংকরী নাথ রায় চৌধুরীর জমিদারিকালে অর্থাৎ ১৮৯৯খ্রিস্টাব্দে কমলগঞ্জ নামে এই স্থানের নামকরন হয়নি। এর বহুপূর্ব থেকেই এটি কমলগঞ্জ নামে পরিচিত ছিল।
কমলগঞ্জ ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে থানা সদরের মর্যাদা পায় সেই হিসাবে প্রতিষ্ঠার ২৩বছরের মধ্যে একটি এলাকাকে থানা সদর করা হবে এ বিষয়েও ভিন্নমত রয়েছে তাদের। তাঁরা সুবে বাংলার অঙ্গীভূত হওয়ার পরপরই অর্থাৎ রাজা সুবিদ নারায়নের পতনের পরপরই
কমলাগঞ্জ বিবর্তিত নাম কমলগঞ্জ হয়েছে বলে ধারণা পোষণ করেন।
কমলগঞ্জ নাম করণ নিয়ে আরও একটি জনশ্রুতি হলো রাজা ভানু নারায়নের পুত্রবধূ রাজা সুবিদ নারায়নের স্ত্রী কমলা রাণীর নামে কমলগঞ্জের সৃষ্টি। কমলারানী রাজনগর থেকে পালকি যোগে কমলগঞ্জ এসে ধলাই নদী দিয়ে নৌপথে ত্রিপুরা বাপের বাড়ি যেতেন।পথিমধ্যে কমলপুর নামক স্থানে বিশ্রাম নিতেন যার ফলে এই দুটি এলাকা কমলাগঞ্জ ও কমলাপুর নামে পরিচিত হয়ে উঠে। তবে এই ধারণার পক্ষে তেমন কোন জুরালো যুক্তি পাওয়া যায়নি।
এলাকার বিশিষ্ট মানুষদের কাছ থেকে জানা যায় ধলাইনদীর পশ্চিমতীর সব সময় ভানুগাছ নামে পরিচিত ছিল যদিও পুরো এলাকাটি ছিল ভানুগাছ পরগনাধীন। ১৮৯৯খ্রিস্টাব্দে নদীর পূর্ব তীরের নামকরণ কমলনারায়নের নামে হলে ১৮৯৯খ্রিষ্টাব্দের পূর্ববর্তী সময় পূর্বতীরের নামও ভানুগাছ হওয়ার কথা কিন্তু এই তীর কোন কালে কখনও ভানুগাছ নামে পরিচিত ছিল না। এ থেকেও অনুমান করা যায় ধলাই নদীর পূর্বতীর ১৮৯৯খ্রিষ্টাব্দ থেকে নয় এরও অনেক অনেক পূর্ব থেকে কমলগঞ্জ নামেই পরিচিত ছিল।
উপরোক্ত বিশ্লেষণ থেকে এটি প্রতীয়মান হয় যে কমলগঞ্জ নামকরণ রাজা সুবিদ নারায়নের শাসনামল অথবা সুবা বাংলার শাসনামল অর্থাৎ মোগল আমলে হয়েছে এটি ১৮৯৯খ্রিস্টাব্দে কোনভাবে হয়নি।
(সৈয়দ মাসুমের ‘কমলগঞ্জ উপজেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য ’গ্রন্থ থেকে সংকলিত )
তথ্য সূত্র :
সিলেটের ইতিবৃত্ত -অচ্যুত চরণ চৌধুরী
হজরত শাহ জালাল ও সিলেটের ইতিহাস -সৈয়দ মুর্তুজা আলী
ভানুগাছের ইতিহাস -নন্দলাল শর্মা
মৌলভীবাজার জেলার জনজীবন -রসময় মোহান্ত
সম্ভাবনাময় মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক সাকির উদ্দিন আহমেদ
কমলগঞ্জ উপজেলা পরিচিতি ,কমলগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক প্রকাশিত।
সৈয়দ আব্দুল মতিন প্রয়াত প্রধান শিক্ষক ,কমলগঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়
প্রয়াত রাধা মোহন সিংহ ,শিক্ষক ,কমলগঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ পড়ুন...
Developed By Radwan Web Service